ভোটের আগেই কি ভোটাধিকার হারাচ্ছেন লাখো মানুষ? নির্বাচন কমিশনের প্রেস নোট ঘিরে তোলপাড়

লিখেছেন: তামিম আখতার (লেখক আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী এবং কোচবিহারের বাসিন্দা। তিনি নিয়মিত সমসাময়িক রাজনীতি ও সামাজিক বিষয় নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী লেখালেখি করেন)।

MD 360 NEWS
4 Min Read
প্রতীকী চিত্র
WhatsApp_Group
সব খবর মোবাইলে পেতে Whatsapp গ্রুপে জয়েন্ট করুন

পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে ভারতের নির্বাচন কমিশন একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি (Press Note) প্রকাশ করেছে।  সেখানে বলা হয়েছে, নির্বাচনকে অবাধ ও সুষ্ঠু করার জন্য বিস্তারিত প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে তাঁদের মতামত নেওয়া হয়েছে।  সেই বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আলোচনায় উপস্থিত ছিল ভারতীয় জনতা পার্টি, ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী), সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস, আম আদমি পার্টিসহ আরও কয়েকটি দল।  সবকিছু পড়লে মনে হয় যেন নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে সবাই সন্তুষ্ট এবং সব কিছু নিয়মমাফিক চলছে।

Join WhatsApp Channel Join Now
Telegram Group Join Now


কিন্তু বাস্তবের প্রশ্নগুলো কোথায়? মানুষের উদ্বেগের কথা কোথায়?

বর্তমানে ভোটার তালিকা সংশোধন বা এস‌আইআর -এর নামে পশ্চিমবঙ্গে লক্ষ লক্ষ ভোটারের নাম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিভিন্ন জায়গায় বলা হচ্ছে, প্রায় ৬০ লক্ষের মতো ভোটার আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন বা যাচাই প্রক্রিয়ায় মধ্যে পড়েছেন; আবার বহু মানুষের নাম সরাসরি তালিকা থেকেও বাদ গেছে।  এই পরিস্থিতিতে প্রথম প্রশ্নটাই স্বাভাবিকভাবে সামনে আসে—এত বড় সংখ্যক মানুষের ভোটাধিকার অনিশ্চিত রেখে নির্বাচন কীভাবে সম্ভব? যাঁরা বহু বছর ধরে ভোট দিয়ে আসছেন, যাঁরা সরকারি নথিতে নাগরিক হিসেবে স্বীকৃত, তাঁরা হঠাৎ করে সন্দেহভাজন হয়ে গেলেন কীভাবে?


এর থেকেও বড় প্রশ্ন হলো—যাঁদের নাম কাটা হয়েছে বা যাচাইয়ের তালিকায় গেছে, তাঁদের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো কিসের ভিত্তিতে? নাগরিকত্ব বা ভোটার হওয়ার যোগ্যতা নির্ধারণের জন্য কোন মানদণ্ড ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটি স্পষ্টভাবে জানানো হচ্ছে না।  অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, একই পরিবারের মধ্যে কেউ ভোটার হিসেবে স্বীকৃত, আবার অন্য কাউকে সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।  কোথাও পাসপোর্ট বা অন্যান্য সরকারি নথি থাকা সত্ত্বেও মানুষকে আবার প্রমাণ দিতে বলা হচ্ছে।  যদি এইসব নথিও যথেষ্ট না হয়, তাহলে একজন সাধারণ নাগরিক ঠিক কীভাবে নিজের পরিচয় প্রমাণ করবেন?


আরও বিস্ময়ের বিষয় হলো, নির্বাচন কমিশনের এই সংবাদ বিজ্ঞপ্তি (Press Note) তে প্রশাসনিক প্রস্তুতি, নিরাপত্তা, কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী মোতায়েন, আইনশৃঙ্খলা, ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (EVM) ব্যবস্থাপনা—এইসব বিষয় নিয়ে বিস্তারিত বলা হলেও মানুষের বাস্তব সমস্যার কথা কার্যত অনুপস্থিত।  যে মানুষগুলো শুনানির জন্য দৌড়াচ্ছেন, পুরনো কাগজপত্র খুঁজে বের করছেন, ভোটাধিকার হারানোর আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন—তাঁদের কথা সেখানে নেই। অথচ গণতন্ত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার কথা ভোটারেরই।


এখানেই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে।  নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে যে বৈঠক হয়েছে, সেখানে দেশের বড় বড় রাজনৈতিক দল উপস্থিত ছিল।  সবাই আলোচনা করেছে বলে সরকারিভাবে জানানো হয়েছে।  তাহলে প্রশ্নটা স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে: যদি সত্যিই লক্ষ লক্ষ মানুষের ভোটাধিকার নিয়ে এত বড় সমস্যা তৈরি হয়ে থাকে, তাহলে সেই বৈঠকে কি এই বিষয়গুলো নিয়ে জোরালোভাবে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল? নাকি বৈঠকে সবকিছু মেনে নেওয়া হয়, আর মানুষের সামনে এসে আলাদা রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়া হয়?


গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা শুধু নির্বাচনে অংশ নেওয়া নয়, নাগরিকদের অধিকার রক্ষা করাও তাঁদের দায়িত্বের অংশ।  যদি মানুষের সামনে এক ধরনের কথা বলা হয়, আর প্রশাসনিক আলোচনায় গিয়ে সব কিছু চুপচাপ মেনে নেওয়া হয়, তাহলে মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহ জন্মায়—এটা কি সত্যিই মানুষের স্বার্থের লড়াই, নাকি সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার রাজনীতি?

সবশেষে প্রশ্নটা আবার সংবিধানের কাছেই ফিরে আসে।  ভারতের সংবিধান প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিককে ভোটাধিকার দিয়েছে। এই অধিকার কোনো প্রশাসনের দয়া নয়, কোনো প্রতিষ্ঠানের অনুগ্রহ নয়—এটি একটি মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকার। যদি প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার নামে লক্ষ লক্ষ মানুষের ভোটাধিকার অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, তাহলে সেটি কেবল নির্বাচন পরিচালনার বিষয় থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে সাংবিধানিক অধিকারের প্রশ্ন।


গণতন্ত্র শুধু ভোটের দিনটাকে ঘিরে তৈরি হয় না।  গণতন্ত্রের আসল শক্তি হলো এই বিশ্বাস যে, প্রতিটি নাগরিকের ভোট সমান মূল্যবান।  তাই যখন লক্ষ লক্ষ মানুষের ভোটাধিকার নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তখন সেই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর দেওয়া শুধু প্রশাসনের নয়, রাজনৈতিক দলগুলোরও দায়িত্ব। নইলে মানুষের মনে একটাই প্রশ্ন ঘুরে ফিরে আসে—গণতন্ত্রের নামে কি সত্যিই মানুষের অধিকার সুরক্ষিত হচ্ছে, নাকি কোথাও সেই অধিকারই ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে পড়ছে?

Share This Article