লক্ষ লক্ষ মানুষকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করার মতো কোনও প্রক্রিয়াই সমর্থনযোগ্য নয়। এমন কোনও পদক্ষেপ, যার ফলে বিপুল সংখ্যক ভারতীয় নাগরিক ভোট দেওয়ার অধিকার হারান কিংবা নিজেদের দেশেই ‘দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক’-এর মতো অবস্থায় চলে যান, তা স্বভাবতই স্বেচ্ছাচারী এমনই মন্তব্য করলেন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি উজ্জ্বল ভূঁইয়া।
রবিবার হায়দরাবাদের নালসার আইন বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ভোটাধিকার, সাংবিধানিক সমতা এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের গুরুত্ব নিয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন তিনি।
বিচারপতি ভূঁইয়া বলেন, ভারতীয় সংবিধানে এমন কোনও ধারণার জায়গা নেই যেখানে এক শ্রেণির নাগরিক ভোটাধিকার ভোগ করবেন এবং অন্য একটি শ্রেণির নাগরিক ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত থাকবেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কোনও প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যদি বিপুল সংখ্যক ভারতীয়কে ভোটাধিকার থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে সেই প্রক্রিয়ার সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠবেই। এ ধরনের গণহারে ভোটাধিকার হরণের পক্ষে কোনও পাল্টা যুক্তিও সমর্থনযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ভারতের সংবিধান প্রণেতাদের সিদ্ধান্তের কথাও তুলে ধরেন বিচারপতি ভূঁইয়া। তিনি বলেন, স্বাধীনতার সময় দেশে নানা ধরনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও সংবিধান প্রণেতারা সর্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের উপর আস্থা রেখেছিলেন। সাধারণ ভারতীয়ের প্রতি সেই আস্থাই দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর অন্যতম ভিত্তি বলে তিনি মনে করেন।
সংবিধানের রূপকার বি আর অম্বেদকরের বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে বিচারপতি ভূঁইয়া ‘এক ব্যক্তি, এক ভোট’ নীতির গুরুত্বও তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যে, একজন কোটিপতি এবং একজন রিকশাচালকের ভোটের মূল্য একই। গণতন্ত্রে এই সমতাই ভোটাধিকারের আসল শক্তি। তাই ভোটার তালিকা থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষের নাম বাদ দেওয়ার মতো কোনও প্রক্রিয়ায় নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার এবং রাজনৈতিক সমতার বিষয়টি উপেক্ষা করা যায় না।
ভোটাধিকারকে সংবিধানের মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি ঠিকই, তবে এর সাংবিধানিক গুরুত্ব রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন বিচারপতি ভূঁইয়া। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সুপ্রিম কোর্ট একাধিকবার ভোটাধিকারের সাংবিধানিক চরিত্রকে স্বীকার করেছে। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করায় ক্ষেত্রে ভোটাধিকার অপরিহার্য। নাগরিকত্ব এবং ভোটাধিকারের মধ্যেও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বর্তমানে নির্বাচন কমিশনের বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা SIR প্রক্রিয়া নিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যে বিতর্ক চলছে, বিচারপতি ভূঁইয়ার এই মন্তব্য সেই আবহেই বিশেষ তাৎপর্য পেয়েছে। যদিও নালসারের অনুষ্ঠানে তিনি সরাসরি নির্বাচন কমিশনের SIR প্রক্রিয়া বা কোনও নির্দিষ্ট রাজ্যের ভোটার তালিকা নিয়ে মন্তব্য করেননি, তবু তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে বর্তমান ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে চলা বিতর্কের মিল খুঁজে পাচ্ছেন অনেকেই।
পশ্চিমবঙ্গেও SIR নিয়ে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক এবং আইনি বিতর্ক তীব্র হয়েছে। ভোটার তালিকা থেকে বিপুল সংখ্যক নাম বাদ পড়া, বিভিন্ন ভোটারের নথি নিয়ে প্রশ্ন ওঠা এবং নাম যাচাইয়ের প্রক্রিয়া নিয়ে বিরোধীদের পক্ষ থেকে একাধিক অভিযোগ করা হয়েছে। এই প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে বিষয়টি সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়িয়েছে এবং মামলা এখনও বিচারাধীন।
এমন পরিস্থিতিতে বিচারপতি ভূঁইয়ার বক্তব্যকে কেন্দ্র করে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে, ভোটার তালিকা সংশোধনের সময় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং নাগরিকের ভোটাধিকার এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য কী ভাবে বজায় রাখা হবে। বিশেষ করে কোনও নাগরিকের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়লে তাঁর কাছে যথাযথ কারণ জানানো, নিজের বক্তব্য জানানোর সুযোগ দেওয়া এবং আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করার বিষয়টি কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেই প্রশ্ন সামনে আসছে।
বিচারপতি ভূঁইয়ার বক্তব্যের মূল সুর হল, ভোটাধিকার শুধুমাত্র ভোটের দিন একটি বোতাম টেপার অধিকার নয়। এর সঙ্গে নাগরিকের রাজনৈতিক সমতা, গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ এবং অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রশ্ন সরাসরি জড়িত। ফলে লক্ষ লক্ষ মানুষকে একসঙ্গে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করার মতো কোনও প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠলে সেটিকে কেবল প্রশাসনিক বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না।
প্রিমিয়াম PVC কার্ড অর্ডার করুন
ওয়াটারপ্রুফ • টেকসই • ফাস্ট ডেলিভারি
💬 WhatsApp এ ক্লিক করুন
