সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি সারা দেশে তুমুল তোলপাড় ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। একটি মামলার শুনানির সময় তিনি বলেন, দেশের বেকার তরুণ-তরুণীদের একটা অংশ আসলে ‘আরশোলার‘ মতো আচরণ করছে। তাঁর দাবি, আসল কোনো কাজ বা চাকরি না পেয়ে এই যুবকেরা সাংবাদিক, সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারী কিংবা তথ্যের অধিকার কর্মী (আরটিআই অ্যাক্টিভিস্ট) সেজে বসেছেন এবং অন্য মানুষকে সারাক্ষণ আক্রমণ করে চলেছেন।
দেশের সবচেয়ে বড় আদালতের প্রধান বিচারপতির মুখ থেকে দেশের যুবসমাজ সম্পর্কে এমন কথা শুনে সমাজমাধ্যমে নিন্দার ঝড় ওঠে। তরুণ প্রজন্ম ও সাধারণ মানুষ মনে করছেন, এটা বেকার যুবকদের চরম অপমান। তবে এই রাগ শুধু ফেসবুক বা টুইটারেই আটকে থাকেনি; এই অপমানের কড়া জবাব দিতে যুবসমাজ এক অভিনব ও মজার প্রতিবাদের পথ বেছে নেয়। তারা প্রতীকীভাবে সম্পূর্ণ নতুন এক রাজনৈতিক দল তৈরি করে ফেলে, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) বা ‘আরশোলা জনতা পার্টি’।
এই অদ্ভুত ও মজার দলটির প্রতিষ্ঠাতা হলেন ৩০ বছর বয়সী এক যুবক, যাঁর নাম অভিজিৎ দীপক। তিনি সোশ্যাল মিডিয়ার প্রচারের কাজে বেশ অভিজ্ঞ এবং এর আগে আম আদমি পার্টির (আপ) হয়ে ২০২০ সালের দিল্লি নির্বাচনে সোশ্যাল মিডিয়া সামলানোর দায়িত্ব পালন করেছিলেন। গত ১৬ মে তিনি প্রথম এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডলে একটি গুগল ফর্ম পোস্ট করে সবাইকে এই নতুন দলে যোগ দেওয়ার কথা বলেন। প্রধান বিচারপতির মন্তব্যে সাধারণ মানুষ এতটাই রেগে ছিলেন যে, এই ডাকে উপচে পড়া সাড়া মেলে। মাত্র তিন ঘণ্টার মধ্যে এই দলের জন্য একটা আস্ত ওয়েবসাইটও বানিয়ে ফেলা হয়। মাত্র ৪ দিনের মাথায় এই প্রতীকী দলটি সোশ্যাল মিডিয়ায় যে জনপ্রিয়তা পেয়েছে, তা দেশের বড় বড় রাজনৈতিক দলের পক্ষেও কল্পনা করা অসম্ভব।
ককরোচ জনতা পার্টির দাবি অনুযায়ী, চার দিনে তাদের মেম্বার বা সদস্য সংখ্যা আড়াই লাখে পৌঁছে গেছে, যার মধ্যে প্রথম তিন দিনেই যোগ দিয়েছেন ৭০ হাজার মানুষ। আর সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, ইনস্টাগ্রামে এই দলের ফলোয়ার সংখ্যা চোখের পলকে ৬৫ লাখ ছাড়িয়ে গেছে, যা সাধারণ মানুষের করতে বছরের পর বছর সময় লেগে যায়।
ইন্টারনেটের এই ঝড় এখন আর শুধু ছাত্র বা বেকারদের মধ্যে আটকে নেই, দেশের বড় বড় রাজনেতাদের কপালেও চিন্তার ভাঁজ ফেলে দিয়েছে। উত্তরপ্রদেশের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদব এই ট্রেন্ড দেখে সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছেন, লড়াইটা এখন আসলে ‘বিজেপি বনাম সিজেপি (ককরোচ জনতা পার্টি)’। বর্তমান দেশের নিট (NEET) পরীক্ষার জালিয়াতি থেকে শুরু করে দেশের নানা সমস্যা ও বেকারত্ব নিয়ে এই আরশোলা পার্টি ইতিমধ্যেই সরব হয়েছে। দেশ চালানোর নিয়মকানুন, নির্বাচন ও বিচার ব্যবস্থাকে পুরোপুরি বদলে ফেলার জন্য তারা ৫টি বড় দাবি নিয়ে একটি ইশতেহার বা ঘোষণাপত্র প্রকাশ করেছে।
তাদের দাবিগুলো হলো সংসদের আসন সংখ্যা না বাড়িয়েই মহিলাদের জন্য সরাসরি অর্ধেক (৫০ শতাংশ) আসন তুলে রাখতে হবে; যেসব নেতা দলবদল করেন, তাঁরা দল ছাড়ার পর পরবর্তী ২০ বছর কোনো নির্বাচনে দাঁড়াতে পারবেন না; বিচারকেরা চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পরপরই কোনো সরকারি লাভজনক পদ বা রাজ্যসভার সদস্য হতে পারবেন না; ভোটার তালিকায় নাম থাকা সত্ত্বেও কোনো আসল ভোটার যদি ভোট দিতে না পারেন, তবে তার জন্য দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে গ্রেপ্তার করতে হবে; এবং যেসব টিভি চ্যানেলের সঞ্চালকেরা একতরফা দালালি বা পক্ষপাতিত্ব করেন, তাঁদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খতিয়ে দেখতে কড়া তদন্ত করতে হবে। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির একটা তাচ্ছিল্যের মন্তব্যকে দেশের যুবসমাজ যেভাবে প্রতিবাদের হাতিয়ার বানিয়ে এক বিশাল আন্দোলনে আঁকার ধারণ করেছে।

