বঙ্গের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরেই নবান্নের অলিন্দে বড়সড় প্রশাসনিক রদবদল। বাংলায় বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী পদে বসার এক সপ্তাহের মধ্যেই রাজ্যে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে দেশছাড়া করার প্রক্রিয়া শুরু করে দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বুধবার বিকেলে নবান্নে এক হাইপ্রোফাইল সাংবাদিক বৈঠক থেকে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, এখন থেকে রাজ্যে কার্যকর হচ্ছে কেন্দ্রীয় সরকারের ‘ডিটেক্ট, ডিলিট এবং ডিপোর্ট’ নীতি। অর্থাৎ, অনুপ্রবেশকারীদের প্রথমে চিহ্নিত করা হবে, তারপর তালিকা থেকে নাম বাদ দিয়ে সরাসরি বিএসএফ এর মাধ্যমে তাঁদের নিজেদের দেশে ফেরত পাঠানো হবে।
এছাড়াও এদিন ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার জন্য বিএসএফ-এর হাতে আপাতত ২৭ কিলোমিটার দীর্ঘ জমি তুলে দিচ্ছে রাজ্য সরকার। এরফলে দীর্ঘদিনের বকেয়া সীমান্ত জট এক লহমায় কেটে গেল সরকারের এই সিদ্ধান্তে। উত্তরবঙ্গ সফর সেরে বুধবার সকালেই কলকাতায় ফেরেন মুখ্যমন্ত্রী। বিকেলে নবান্নের সাংবাদিক বৈঠকে তাঁর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন সীমান্ত সুরক্ষা বাহিনীর (বিএসএফ) উচ্চপদস্থ আধিকারিকেরা। সেখানেই শুভেন্দু অধিকারী নিজেয় ঘোষণা করেন, এছাড়াও জমি ক্রয়ের প্রয়োজনীয় অর্থ বিএসএফ নিজেই বহন করছে।
মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ, “পূর্বতন সরকার তোষণ রাজনীতির কারণে দীর্ঘদিন ধরে বিএসএফ কে জমি দেওয়া আটকে রেখেছিল। রাজ্যের ২২০০ কিলোমিটার সীমান্তের মধ্যে ১৬০০ কিলোমিটারে কাঁটাতার থাকলেও, বাকি ৬০০ কিলোমিটার অরক্ষিত ছিল। ফলে দেশের নিরাপত্তা বড়সড় ঝুঁকির মুখে পড়ে। আমরা দায়িত্ব নিয়েই সেই জটিলতা কাটালাম।” সীমান্ত সুরক্ষাকে নিশ্ছিদ্র করতে এখন থেকে নিয়মিত জেলা ও থানা স্তরে ‘কো-অর্ডিনেশন মিটিং’ বা সমন্বয় বৈঠক করা হবে বলেও জানান তিনি।
এ দিন সাংবাদিক বৈঠকে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (CAA) এবং অবৈধ অনুপ্রবেশের বিষয়টি সবিস্তারে খোলাশা করেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, ভারত সরকারের নির্দেশিকা মেনে রাজ্যে এই আইন কঠোরভাবে কার্যকর করা হচ্ছে। তবে কার ওপর এই আইনের খাঁড়া নেমে আসবে, আর কে পাবেন আইনি সুরক্ষা তা নিয়ে সাধারণ মানুষের বিভ্রান্তি দূর করেছেন তিনি।
মুখ্যমন্ত্রীর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় সরকারের অভিবাসন এবং বিদেশি আইনের ৩৩ ধারা ও গ্যাজেট বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার হয়ে বা সেই আশঙ্কায় ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত যে সমস্ত হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পার্সি এবং খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মানুষ ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন, তাঁরা শরণার্থীর মর্যাদা পাবেন। সিএএ-র এই রক্ষাকবচ যাঁদের ওপর রয়েছে, পুলিশ তাঁদের কোনওভাবেই হেনস্থা বা আটক করতে পারবে না।
কিন্তু, এই নির্দিষ্ট সময়সীমা এবং সাতটি সম্প্রদায়ের বাইরে থাকা যে কোনও ব্যক্তি, যাঁরা বৈধ পাসপোর্ট-ভিসা ছাড়া ভারতে প্রবেশ করেছেন, তাঁরা সম্পূর্ণ বেআইনি অনুকিন্তু, এই নির্দিষ্ট সময়সীমা এবং সাতটি সম্প্রদায়ের বাইরে থাকা যে কোনও ব্যক্তি, যাঁরা বৈধ পাসপোর্ট-ভিসা ছাড়া ভারতে প্রবেশ করেছেন, তাঁরা সম্পূর্ণ বেআইনি অনুপ্রবেশকারী হিসেবে গণ্য হবেন। একইসঙ্গে, যাঁরা বৈধ নথিপত্র নিয়ে এ দেশে আসার পর ভিসার মেয়াদ ফুরিয়ে গেলেও অবৈধভাবে থেকে গিয়েছেন, তাঁদের বিরুদ্ধেও একই আইনি পদক্ষেপ করা হবে।প্রবেশকারী হিসেবে গণ্য হবেন। একইসঙ্গে, যাঁরা বৈধ নথিপত্র নিয়ে এ দেশে আসার পর ভিসার মেয়াদ ফুরিয়ে গেলেও অবৈধভাবে থেকে গিয়েছেন, তাঁদের বিরুদ্ধেও একই আইনি পদক্ষেপ করা হবে।
জানা গেছে, ইতিমধ্যে রাজ্য প্রশাসনের শীর্ষ স্তর থেকে পুলিশ প্রশাসনকে কড়া গাইডলাইন পাঠানো হয়েছে। নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী, অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের আটকের পর রাজ্য পুলিশ তাঁদের বায়োমেট্রিক তথ্য (আঙুলের ছাপ ও চোখের মণি) এবং ডেমোগ্রাফিক বিবরণ সংগ্রহ করবে। এই সমস্ত তথ্য বাধ্যতামূলকভাবে কেন্দ্রের ‘ফরেনার্স আইডেন্টিফিকেশন পোর্টাল’ এ নথিভুক্ত করা হবে। এরপর রাজ্য পুলিশ ধৃতদের সরাসরি বিএসএফ এর হাতে তুলে দেবে। সীমান্তরক্ষী বাহিনী ওপার বাংলার সীমান্তরক্ষী বাহিনী বা বিজিবি (বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ) র সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনা সাপেক্ষে তাঁদের বাংলাদেশ সীমান্তে পুশব্যাক বা ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করবে।
এ দিন মুখ্যমন্ত্রী জানান, গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালের ১৪ মে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের পক্ষ থেকে এই মর্মে একটি কড়া নির্দেশিকা নবান্নে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু তৎকালীন তৃণমূলের সরকার তা কার্যকর করতে দেয়নি। রাজ্য পুলিশের ডিজি এবং মুখ্যসচিবকে ইতিমধ্যেই সীমান্ত সংলগ্ন সমস্ত থানায় দেশের এবং রাজ্যের সার্বিক সুরক্ষার স্বার্থে এই আইন অবিলম্বে কার্যকর করার নির্দেশ দিয়েছেন নতুন মুখ্যমন্ত্রী।

