প্রধান বিচারপতির মন্তব্যের প্রতিবাদে জেন-জির নতুন দল ‘ককরোচ জনতা পার্টি’; ৪ দিনেই সদস্য পৌনে ২ লাখ, সবাই কেন নাম লেখাচ্ছেন এই দলে?

Ealiash Rahaman
By
Ealiash Rahaman
বিগত প্রায় পাঁচ বছর ধরে ডিজিটাল মিডিয়ার কাজের সঙ্গে যুক্ত। দেশ ও বিদেশের সমস্ত রকম খবরাখবর রাখতে ও তা প্রতিবেদন আকারে লিখতে অভ্যস্থ।
5 Min Read
WhatsApp_Group
সব খবর মোবাইলে পেতে Whatsapp গ্রুপে জয়েন্ট করুন

সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।  একটি মামলার শুনানির সময় তিনি মন্তব্য করেন, বেকার তরুণ-তরুণীদের একাংশ আরশোলার মতো আচরণ করছেন।  তাঁর মতে, কোনো মূল পেশায় জায়গা না পেয়ে এই যুবকেরা সাংবাদিক, সমাজমাধ্যম ব্যবহারকারী কিংবা তথ্যের অধিকার কর্মী (আরটিআই অ্যাক্টিভিস্ট) হিসেবে কাজ শুরু করেন এবং অন্যকে আক্রমণ করে চলেন।  দেশের শীর্ষ আদালতের প্রধান বিচারপতির এমন মন্তব্য প্রকাশ্যে আসতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিন্দার ঝড় ওঠে।  তরুণ প্রজন্ম ও নেটিজেনদের একাংশ একে যুবসমাজের প্রতি চরম অবমাননা হিসেবে গণ্য করেন।  এই ক্ষোভ ও প্রতিবাদের অভিনব বহিঃপ্রকাশ হিসেবেই জন্ম নেয় সম্পূর্ণ নতুন ও ব্যঙ্গাত্মক এক প্রতীকী রাজনৈতিক দল ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা ‘আরশোলা জনতা পার্টি’।

Join WhatsApp Channel Join Now
Telegram Group Join Now

যদিও পরবর্তীতে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত দুঃখপ্রকাশ করে জানায়, তাঁর বক্তব্যের ভুল ব্যাখ্যা করা হয়েছে।  তিনি মূলত ভুয়া ডিগ্রি নিয়ে আইন পেশায় আসা এবং গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে বিভ্রান্তি ছড়ানো নির্দিষ্ট কিছু ‘পরজীবী’ মানুষের সমালোচনা করতে চেয়েছিলেন; দেশের সামগ্রিক যুবসমাজকে ছোট করা তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না।  তবে প্রধান বিচারপতির এই সাফাইতেও ক্ষোভের আগুন স্তিমিত হয়নি, বরং ‘জেন-জি’ (Z-Gen) বা নতুন প্রজন্মের মধ্যে এই আন্দোলন আরও বেগবান হয়ে উঠেছে।

এই অভিনব ও ব্যঙ্গাত্মক ফ্রন্টটির প্রতিষ্ঠাতা ৩০ বছর বয়সী যুবক অভিজিৎ দীপক।  রাজনৈতিক প্রচার ও সামাজিক মাধ্যমের কলাকৌশলে অভিজ্ঞ অভিজিৎ এর আগে আম আদমি পার্টির (আপ) সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং ২০২০ সালের দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনে দলটির সমাজমাধ্যমভিত্তিক প্রচারের দায়িত্ব সামলেছেন।

গত ১৬ মে তিনি প্রথম এক্স হ্যান্ডলে একটি গুগল ফর্ম পোস্ট করে এই দলে যোগ দেওয়ার কথা বলেন।  ব্যাপক সাড়া মেলায় মাত্র তিন ঘণ্টার মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ ওয়েবসাইটও তৈরি করে নেয়।

সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ককরোচ জনতা পার্টির মূল ভাবাদর্শ হলো—ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র এবং অলসতা।  এটি কোনো জাতিবিদ্বেষী সংগঠন নয়, বরং মহাত্মা গান্ধী, বাবাসাহেব আম্বেদকর ও জওহরলাল নেহরুর আদর্শকে পাথেয় করে প্রগতিশীল পথে চলতে বদ্ধপরিকর।  প্রতিষ্ঠাতা অভিজিতের মতে, আরশোলা হলো চরম সহিষ্ণুতার প্রতীক।  এটি কেবল কোনো সাময়িক রসিকতা নয়, বরং তরুণদের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরি করা, সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থাকে প্রশ্ন করতে শেখানো এবং যুবসমাজকে সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হতে উৎসাহিত করাই এই সংগঠনের মূল লক্ষ্য।

এই দলে নাম লেখানোর জন্য যে বিষয়গুলো আপনার মধ্যে থাকতে হবে

ককরোচ জনতা পার্টিতে যোগদানের জন্য কোনো ধর্ম, জাতি বা লিঙ্গ পরিচয় বিবেচনা করা হয় না।  তবে দলটির পক্ষ থেকে চারটি শর্ত সিলেক্ট করেছে, সদস্যপদ নেড়া জন্য।

১. এরজন্য অবশ্যই আপনাকে কর্মহীন হতে হবে তা সে বাধ্য হয়েই হোক, নিজের ইচ্ছায় হোক কিংবা কোনো আদর্শগত কারণেই হোক।

২.এটি কেবল শারীরিক অলসতার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, তবে চিন্তাভাবনা বা মস্তিষ্কের সক্রিয়তায় কোনো লাগাম থাকবে না।

৩.সর্বক্ষণ অনলাইনে থাকা বা দৈনিক অন্তত ১১ ঘণ্টা ইন্টারনেটে বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটিভ থাকতে হবে, যার মধ্যে বাথরুম ব্রেকও অন্তর্ভুক্ত।

৪.যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় বিষয়ে অত্যন্ত তীক্ষ্ণ, সৎ এবং যৌক্তিক সমালোচনা করার দক্ষতা থাকতে হবে।

মাত্র ৪ দিনের পথচলায় এই প্রতীকী রাজনৈতিক ফ্রন্টটি সমাজমাধ্যমে অবিশ্বাস্য জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।  ককরোচ জনতা পার্টির দাবি অনুযায়ী, ইতিমধ্যে তাদের নিবন্ধিত সদস্য সংখ্যা ১ লাখ ৭০ হাজারে পৌঁছেছে; যার মধ্যে প্রথম ৭২ ঘণ্টাতেই যুক্ত হয়েছেন প্রায় ৭০ হাজার মানুষ।  সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে দলটির ফলোয়ার সংখ্যা ইতিমধ্যেই ২.২ মিলিয়ন (২২ লাখ) ছাড়িয়ে গেছে।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলন কেবল শিক্ষার্থী বা বেকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং মূলধারার রাজনীতিক ও বিশিষ্টজনদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।  সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের দুই প্রভাবশালী সংসদ সদস্য মহুয়া মৈত্র এবং কীর্তি আজাদ প্রকাশ্যে এই দলে যোগদানের ঘোষণা দিয়েছেন।  এ ছাড়া প্রখ্যাত সমাজকর্মী অঞ্জলি ভরদ্বাজ এবং সাবেক আমলা আশিস যোশীর মতো ব্যক্তিত্বরাও এই যুব আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে দলে শামিল হয়েছেন।

নিট (NEET) পরীক্ষা কেলেঙ্কারি থেকে শুরু করে দেশের চলমান নানা সংকট নিয়ে ইতিমধ্যে সোচ্চার হয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি।  দেশের শাসন ও নির্বাচন ব্যবস্থাকে খোলনলচে বদলে দেওয়ার প্রত্যয়ে তারা একটি ৫ দফা সংবলিত রাজনৈতিক ইশতেহারও প্রকাশ করেছে।

ইশতেহারের মূল দাবিগুলো:

১. সংসদের মোট আসনসংখ্যা না বাড়িয়েই নারীদের জন্য ৫০ শতাংশ আসন সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে।
২. দলবদলু বিধায়ক এবং সংসদ সদস্যরা দল ছাড়ার পর পরবর্তী ২০ বছর কোনো নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না।
৩. বিচারকদের অবসরের পরপরই কোনো রাজনৈতিক সুবিধা বা রাজ্যসভার সদস্যপদ দেওয়া যাবে না।
৪. ভোটার তালিকায় নাম থাকা সত্ত্বেও কোনো বৈধ ভোটার ভোট দেওয়া থেকে বাদ পড়লে দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে গ্রেপ্তার করতে হবে।
৫. পক্ষপাতদুষ্ট সংবাদমাধ্যম বা ‘গোদি মিডিয়া’র সঞ্চালকদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টকে কঠোর তদন্তের আওতায় আনতে হবে।

Share This Article
বিগত প্রায় পাঁচ বছর ধরে ডিজিটাল মিডিয়ার কাজের সঙ্গে যুক্ত। দেশ ও বিদেশের সমস্ত রকম খবরাখবর রাখতে ও তা প্রতিবেদন আকারে লিখতে অভ্যস্থ।